ছাত্র আন্দোলনের হত্যা মামলায় মমতাজ বেগম গ্রেপ্তার
এমপি মমতাজকে আমার সত্যি সত্যিই খুনী মনে হয়। জুলাইয়ের খুন খারাবীতে মমতাজের দায় কতটুকু জানি না। থাকতে পারে, নাও থাকতে পারে। কিন্তু একটা খুনে তিনি প্রত্যক্ষভাবে দায়ী, পুরোদস্তুর দায়ী, শতভাগ দায়ী। এমপি মমতাজ শিল্পী মমতাজকে খুন করেছেন।
আমার কাছে মমতাজ দুইটা আলাদা সত্ত্বা। মানুষ এক, পরিচয় ভিন্ন। একজন, গণমানুষের প্রিয় মমতাজ, অন্যজন শেখ হাসিনার প্রিয় মমতাজ। একজন গান ও গলার মাধ্যমে ছড়িয়েছে ভালোবাসা ও সম্প্রীতির বাণী, অন্যজন বিদ্বেষ চাটুকারিতা ও ঘৃণা। দুজন একদম মিলে না, একেবারেই মিলে না।
মমতাজকে দেশের শিক্ষিত ও শহুরে মানুষ প্রথম দেখে ইত্যাদিতে, ২০০০ সালে। ইত্যাদির দর্শকদের সামনে তিনি প্রথম টিভিতে এসে গান “রিটার্ন টিকেট হাতে লইয়া আইসাছি এই দুনিয়ায়, টাইম হইলে যাইতে হবে যাওয়া ছাড়া নাই উপায়।” গানের পাশাপাশি চমকানোর মতো একটা তথ্য দেন তিনি। হানিফ সংকেতকে জানান, তাঁর ইতোমধ্যে প্রকাশিত গানের অ্যালবামের সংখ্যা সাড়ে পাঁচশ! মমতাজের বয়স তখন মাত্র ২৬। ২৬ বছরের জীবনে পাঁচশ অ্যালবাম অবিশ্বাস্য, অসম্ভব, আশ্চর্যজনক। পৃথিবীতে কারো এ নজির ছিল না। গিনেজ বুক কর্তৃপক্ষ যোগাযোগ করে মমতাজের সাথে। মমতাজ ৫০০ টা অ্যালবামের প্রমাণ দেখিয়ে সার্টিফিকেট পেয়ে যান। বিশ্বের সর্বোচ্চ অ্যালবাম করা শিল্পী হিসেবে বিশ্বরেকর্ড। বয়স তখনো তাঁর ত্রিশ হয়নি।
পনের বছর বয়সে অ্যালবাম শুরু করলে মমতাজ বছরে গড়ে ৫০ টা অ্যালবাম করেছেন। মাসে ৪ টা, সপ্তাহে একটা। অবিশ্বাস্য ফিগার। আরো অবিশ্বাস্য লাগে যখন মনে পড়ে অ্যালবাম মমতাজের মূল পেশা ছিল না। মাঠে ঘাটে, মাজারে, মেলায়, পালা পার্বনে স্টেজে গান-কবিগান করাই ছিল মমতাজের মূল পেশা। বিভিন্ন ইন্টারভিউতে তিনি বহুবার বলেছেন, তাঁর জীবন ছিল গানে সীমাবদ্ধ। ঘন্টার পর ঘন্টা হেঁটে প্রোগ্রামে যেতেন, গান করতেন, হেঁটে ফিরতেন, আবার কোথাও যেতেন এবং আবার গান। গানের বাইরে কিছুই নেই।
নব্বই দশক ক্যাসেট ব্যবসার স্বর্ণযুগ ছিল। প্রোডাকশন কোম্পানীগুলো তখন চুটিয়ে ব্যবসা করছে। প্রত্যেক জনপ্রিয় শিল্পীর ক্যাসেট তো বের হয়ই, আরো আছে প্রতিটা সিনেমার আলাদা অ্যালবাম। বাজে ইনভেস্টের প্রশ্নই আসে না। এত গরম মার্কেটে একজন শিল্পী একাই সাড়ে পাঁচশ ক্যাসেট করেছে। কী ভীষণ জনপ্রিয়তা ছিল মমতাজের!
পৃথিবীতে খুব অল্প মানুষ আছে যাদের জীবন নিয়ে সিনেমা হয়। বেঁচে থাকা অবস্থায় নিজের বায়োগ্রাফি দেখে আরো কম মানুষ। জীবিত ও বয়স ত্রিশের কম এবং কোনো যুদ্ধ টুদ্ধ করেনি এমন মানুষ নিয়ে জগতে বোধহয় একটাই মুভি হয়েছে। মুভির নাম “মমতাজ।”
আমার ধারণা মমতাজের জীবনী নিয়ে যে আস্তো একটা মুভি আছে, এটা এ প্রজন্মের খুব কম লোক জানে। সেই মুভিটাও কোনো রকম বানানো হয়েছে এমন না। হুমায়ূন ফরিদী, মাসুম আজিজ, প্রবীর মিত্র, হেলাল খান, কাবিলা, আনোয়ারা, আফজাল শরীফ...তখনকার সময়ের অত্যন্ত ব্যস্ত ও জনপ্রিয় এক ঝাঁক শিল্পী ছিলেন সিনেমায়। ৬ বছর আগে মুভিটা ইউটিউবে রিলিজ হয়েছে। ভিউ ২০ মিলিয়নের বেশি। বহু জনপ্রিয় বাংলাদেশী সিনেমার ভাগ্যে এত ভিউ জুটে না।
মমতাজ যেমন এমপি ও শিল্পী দুইভাগে বিভক্ত, শিল্পী মমতাজেরও আছে তিনটা সাবক্যাটাগরি। একটা ভাগে তিনি গেয়েছেন “ফাইট্টা যায়”, “পাঙ্খা” “যৌবন একটা গোল্ডলিফ সিগারেট” “নান্টু ঘটক”, “লোকাল বাস।” অন্যভাগে আছে “আকাশটা কাঁপছিল ক্যান”, “তের কোটি মানুষ”, “মানুষের মনুষত্ব নাই”, “মায়ের কান্দন যাবজ্জীবন” গোছের ভাবের গান। মাঝামাঝি একটা ক্যাটাগরি আছে। সেখানে গেয়েছেন “না জানি কোন অপরাধে” “বান্ধিলাম পীরিতের ঘর”, “বধূ বেশে কন্যা যখন এলোরে”, “আগে যদি জানতামরে বন্ধু তুমি হইবা পর”...
আশ্চর্যের ব্যাপার, প্রত্যেক ধাঁচের গানেই তিনি সফল। মমতাজ যতদিন শিল্পী মমতাজ ছিলেন, এমপি থেকে ফাঁক ফোঁকরে যখন আবার শিল্পী হয়েছেন...প্রত্যেকবার সোনা ফলেছে তাঁর গলায়। এমপি মমতাজকে মানুষ ট্রল করেছে, গালি দিয়েছে, অভিশাপও দিয়েছে দলে দলে। সেই মানুষজনই আবার দলে দলে শুনেছে তাঁর গান। বধূ বেশে কন্যা যখন এলোরে বাংলা বাংলা সিনেমার গানের ইতিহাসে সবচেয়ে বেশি ভিউ পেয়েছে। এমপি হবার পরের গান লোকাল বাস হয়েছে অভাবনীয় জনপ্রিয়। মানুষ শিল্পী মমতাজকে বাঁচিয়ে রেখেছে বরাবরই।
অসামান্য প্রতিভার পাশাপাশি জীবনের শুরুতেই আকাশ ছোঁয়া জনপ্রিয়তার ভাগ্য জগতে অতি অল্প মানুষের হয়। ভাগ্যের ঠিক অপরপীঠে লুকিয়ে থাকে দুর্ভাগ্য। মমতাজের দুর্ভাগ্য, তিনি নিজের ওজন জানতেন না, নিজের মূল্য অনুমান করতে পারেননি।
সকল আর্টিস্ট, সাহিত্যিক ও সেলিব্রেটিদের একটা বাউন্ডারি লাইন থাকে। তাদের হাতের কাছে যখন অগণিত স্বর্গীয় ফল, তখনই কাছে পীঠে লুকানো থাকে একটা গন্দম ফলের গাছ। খ্যাতির সাগর, অর্থের ঝনঝনানি উপভোগের পাশাপাশি মানুষকে গন্দম ফলটার দিকে খেয়াল রাখা লাগে। গন্দম টানবে, ডাকবে, বলবে, এই ফল না খেলে কিসের স্বর্গ? কিন্তু হাত সামলে রাখতে হবে। একবার গন্দম মুখে নিলেই শেষ। পতন।
বাংলাদেশের সেলিব্রেটিদের ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড়ো গন্দমের নাম রাজনীতি। শিল্পী সাহিত্যিকদের রাজনৈতিক মতাদর্শ ও চর্চা অবশ্যই থাকবে। রাজনীতিতে সরাসরি জড়াতেও আপত্তি নেই। আর্টিস্ট সেলিব্রেটিরা আগেও এসবে জড়িয়েছে, পরেও জড়াবে। কিন্তু একটা কথা পরিষ্কার থাকা লাগবে, একটা শিল্পী প্রথমে শিল্পী পরে রাজনীতিবীদ। গণমানুষ যাকে খ্যাতি দিয়েছে, তার কথা, জীবনযাত্রা অন্য সকলের মতো হলে হবে না।
মমতাজ গন্দমটা খেয়ে ফেললেন। আকাশ ছোঁয়া জনপ্রিয়তা ও যথেষ্ট সচ্ছল জীবন যাপন করেও তাঁর মনে হলো, এবার একটু পাওয়ার দরকার। খেয়ে না খেয়ে মাইলের পর মাইল পায়ে হেঁটে গান করা মানুষটার তততিনে গাড়ি বাড়ি এমনকি দুই দুইটা হাসপাতালও হয়ে গেছে। দেশ ছাপিয়ে বিদেশে মহাসমারোহে করছে স্টেজ শো। কিন্তু মমতাজের এখন আরো দরকার। মাটির মানুষের মমতাজকে ভারী দালানের সংসদে যাওয়াই লাগবে।
মমতাজের রাজনৈতিক অভিজ্ঞতা ছিল না। নেই বিদ্যার ভারও। বিনোদনের কোটায় সংসদে গিয়ে তিনি বিনোদনের কাজটাই করলেন। পদ্মা সেতু নিয়ে গান, শেখ হাসিনা নিয়ে চটুল স্তবক, জিয়াউর রহমানকে নিয়ে কটূক্তি, হাস্যকর সব বক্তব্য। মমতাজকে কেউ বলেনি, তিনি নিজে নিজেকে খুন করছেন। স্বর্গ থেকে তাঁর পতন হচ্ছে। হয়তো অনেকে বলতে চেয়েছে, কিন্তু মমতাজ পর্যন্ত গলার আওয়াজ যায়নি। মমতাজের মেইনট্রিম উত্থান, গিনেজ বুকে নাম, সিনেমা, নিজের করা হাসপাতাল...এই সবটুকুই হয়েছিল বিএনপির আমলে। তিনি অন্তত বিএনপিকে এতটা শুলে না চড়ালেও পারতেন।
রাজনীতির গন্দম খেয়ে বর্তমানে জেল ও জেলের বাইরে নির্বাসনে আছেন আমাদের অতি প্রিয় বেশ কিছু মানুষ। মাশরাফি, সাকিব, আসাদুজ্জামান নূর, সুবর্ণ মোস্তফা, রিয়াজ...অনেক নাম। ক্রিকেটারদের ক্যারিয়ার বয়স চল্লিশ পর্যন্ত। তাদের কেরামতি এরপর মোটামুটি শেষ। অন্যদেরও প্রয়োজনীয়তা ফুরিয়েছে অথবা অন্তত বিকল্প আছে। মমতাজের বিকল্প নেই। তাছাড়া শিল্পীদের ক্যারিয়ার আজীবনের। মৃত্যুর আগে পর্যন্ত শিল্পী সার্ভিস দিতে পারেন। মমতাজের সামনে পুরোটা জীবন পড়ে ছিল।
মমতাজ পাবলিক প্লেসে প্রথম গান করেন ৭ বছর বয়সে। বাবাকে আবদার করার সাহস না পেয়ে বাবার বন্ধুকে ধরে তিনি গান “আমি ভাবছিলাম কি এই হালে দিন যাবে রে সুজনও নাইয়া”। চার যুগ পরে এসে রিমান্ড ঘরে বসেও হয়তো তিনি এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজে বেড়াচ্ছেন। এমন দিন আসবে কখনো কি আসলেই ভেবেছিলেন?
টিভি পর্দার প্রথম গানে বলেছিলেন, “রিটার্ন টিকেট হাতে লইয়া আইসাছি এই দুনিয়ায়, টাইম হইলে যাইতে হবে যাওয়া ছাড়া নাই উপায়।”
এমপির টিকেটটা যখন তিনি হাতে তুলে নিয়েছিলেন, জানতেন এটা সিংগেল ট্রিপ টিকেট নয়? তিনি ২০১৪ তে ফিরতে পারতেন, ১৮ তে ফিরতে পারতেন, ফিরতে পারতেন ২৪ এও। মমতাজ পেছনে না তাকিয়ে এতবেশি দূরে চলে গেলেন, ফিরে দেখলেন কিছুই আর বাকি নেই।
গানের পাশাপাশি ভায়োলিনটাও অসম্ভব ভালো বাজাতেন মমতাজ। তিনি যদি এই কুৎসিত রাজনীতিতে না জড়াতেন, এমনকি বিগত ১৬ বছর একটাও গান না গাইতেন...তবুও লিজেন্ড রয়ে যেতেন আজীবন। কোথাও বেহালাটা কাঁধে নিয়ে স্টেজে দাঁড়ালেই মানুষ ভিড় জমাত। নতুন যুগের ফোক শিল্পীরা তাঁর পা ছুঁয়ে যেত মঞ্চে।
আত্মগোপনে ছিলেন মমতাজ। আওয়ামী এমপি ও কুশীলবদের সকলেই জান প্রাণ দিয়ে লুকিয়ে আছে যে যার জায়গায়। বিশেষত দেশে যারা আছে, শব্দ করছে না কোথাও। মমতাজ গত অক্টোবরে আশ্চর্য একটা কাজ করে বসেন। আত্মগোপনে বসে নিজের নিরাপত্তাকে ঝুঁকিতে ফেলে ব্যক্তিগত আইডিতে একটা গান আপলোড করেন। “আমার হাত বান্ধিবি পাও বান্ধবী মন বান্ধিবী কেমনে?”
আমার ধারণা শিল্পী সত্ত্বার বিদ্রোহ সইতে না পেরেই এই কাজটা করেছেন। গানকে কবর দিয়েছিলেন এমপি ও রাজনীতির প্রলেপে। এখন কোনোটাই নেই। গান বের হয়ে পড়েছে হুড়মুড় করে।
বিশ বাইশ বছর আগে “শোক সংবাদ, মমতাজ বেঁচে নেই” নামে মমতাজের একটা অদ্ভুত গান বের হয়। গানের লিরিক এমন,
“এক কাপ চা নিয়ে ভাগ করে খাওয়া, আড্ডার টেবিলে বসে
মঞ্চে শ্রোতাদের হাততালি পাওয়া, আমার এই বাংলাদেশে
সব হয়ে যাবে স্মৃতি, স্মৃতি হবে জ্বালা গীতি, দেহ থেকে প্রাণটুকু বেরুলেই
লেখা হবে পত্রিকায় শোক সংবাদ করে মমতাজ আর ভবে বেঁচে নেই।”
একজন মানুষ, বয়স যার ত্রিশও হয়নি। নিতান্ত মাটির গন্ধমাখা মেয়ে। কতটা জনপ্রিয়তা, খ্যাতি ও ভালোবাসা পেলে একজন নিজের মৃত্যু টপিক বানিয়ে তখন গান করতে পারে, ভেবে পাই না। এই গানটা মারাত্মক বিষাদময়। শুনতে গেলে মনে হবে আসলেই শিল্পী মমতাজের মৃত্যু চোখের সামনে দেখা যাচ্ছে। মৃত্যুর পরের গোসল, দাফন, দেহ ক্ষয়ে যাওয়ার সবটার বর্ণনা আছে গানে।
শিল্পী মমতাজের মৃত্যু আমরা অবশ্য চোখের সামনেই দেখেছি। মাটির মানুষের প্রিয় মমতাজ পাথুরে সংসদে গিয়ে নীরবে মৃত্যুবরণ করেছেন। তাঁর মৃত্যু হাততালি দিয়ে উদযাপন করেছে কয়েকশো লোক যাদের প্রায় কারো সঙ্গে শিল্পের শ এর সংযোগও নেই।
৪ দিন পর রিমান্ড শেষ হবে মমতাজের। কিছুদিন বা কয়েক বছর জেল খেটে বের হয়ে আসবেন তিনি। মানুষ খুনের দায় সম্ভবত প্রমাণিত হবে না, প্রমাণিত হলেও বেশি কিছু হবার নয়। মমতাজ এই দায় থেকে এক সময় ঠিকই মুক্তি পাবেন। হয়তো আবার গানও গাইবেন আগের মতো।
প্রশ্ন হচ্ছে, মমতাজ কি শিল্পী মমতাজ কি আবার জীবিত হতে পারবেন? ২০ বছর আগে ঝাঁকড়া চুল, দীপ্ত চোখ ও তরবারি গলার মমতাজ ফিরতে পারবেন আর কখনো? জীবন পেলেও এই ক বছর নিজেকে হত্যার দায় থেকে আদৌ কোনোদিন মুক্তি পাবেন?






.png)















